Mountain Railway of Darjeeling Himalaya: Toy-Train or Time-Machine?

 

ষোলো বছরের কিশোর সুকুমারকে নিয়ে শিলিগুড়ি থেকে টয়ট্রেনে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। সেই ট্রেনযাত্রার গল্প লিখেছিলেন ছোটদের ‘মুকুল’ পত্রিকায়। লেখাটা পড়ছিলাম কেভেন্টার্সের ছাদের সেই টেবিলটায় বসে, যেখানে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র শুটিং হয়েছিল। যে ঠাকুরদা, বাবা আর নাতিকে আঁকড়ে আঁকড়ে লতিয়ে ওঠা আমার ছোটবেলা, ডালপালা মেলা আমার বড়োবেলা – সেই তিন প্রজন্মকে এমনিভাবে একসঙ্গে মুহূর্তবন্দি করে ফেলার রোমাঞ্চও ফিকে হয়ে যাচ্ছিল, যখন লেখাটার প্রতিটা লাইন পড়তে পড়তে বুঝতে পারছিলাম আমার আজকের এই টাইমফ্রেমের সঙ্গে কি আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছে ১১৫ বছর আগেকার উপেন্দ্রকিশোরের টাইমফ্রেম। মেলাচ্ছে কে! একটা চওড়ায় দু-ফুটিয়া রেলট্র্যাকের ওপর দিয়ে চলা একটা দুকামরার খুদে খেলনাগাড়ি, যাতে চড়ে আমি তার আগের দিনই শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পুরো রাস্তাটাই উঠে এসেছি। বাইরের খোলসে চাকচিক্য, একটু আধুনিক কেতার চেয়ার আর কয়লার বদলে ডিজেলে টানা ইঞ্জিন – এইটুকু ছাড়া বাকি সবটুকুই যেমন ছিল সেই উপেন্দ্রকিশোরের আমলে, এখনও তেমনি আছে। এখানে একটু উপেন্দ্রকিশোর কোট করার লোভ সামলাতে পারছি না-
“শিলিগুড়ি হইতে দার্জিলিং প্রায় পঞ্চাশ মাইল। এই পথটুকু যাইতেই এই রেলের সাড়ে ছ-ঘন্টার কম সময়ে কুলায় না।… এই রেল প্রস্তুত করিতে কতখানি বুদ্ধি খরচ হইয়াছিল, তাহা আর আমাদের ভাবিয়া দেখিবার দরকার হয় না। কিন্তু তথাপি এই পথে চলিতে চলিতে এক-এক জায়গায় এমন এক-একটা চমৎকার কৌশল চক্ষে পড়ে যে, তখন একবার এই রেল যিনি প্রস্তুত করিয়াছিলেন তাঁহার বুদ্ধির কথা না ভাবিয়া থাকিতে পারা যায় না।’’

একালের ডিজেলে টানা ইঞ্জিন আর সেকালের মতো কয়লার ইঞ্জিন পাশাপাশি

এই লাইনগুলো পড়তে পড়তে এমন একটা গা-শিরশিরানি ভালো লাগার অনুভূতি হচ্ছিল! টয়ট্রেন যেন টাইমমেশিন হয়ে উপেন্দ্রকিশোরের, সুকুমারের সহযাত্রী করে দিল আমায়। নাহলে আজ যখন আমার টাইমফ্রেমে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার পরতে পরতে মানুষের বুদ্ধির আর দুর্বুদ্ধির প্রমাণ থইথই করতে দেখছি, তখন ১৮৮১ সালে তৈরি হিমালয়ান রেলের স্রষ্টাদের বুদ্ধি নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের মতোই অবাক হচ্ছি কেন? কারণ ইউনেস্কো ওয়র্ল্ড হেরিটেজের তকমা দিয়েছে বলে এক্ষেত্রে অন্তত সাবেককালের কৌশলগুলোকে যত্ন করে জিইয়ে রাখতে হয়েছে। তাই ডিনামাইট দিয়ে দুমাদ্দুম পাহাড় ফাটিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তার মধ্যে দিয়ে ধাঁ ধাঁ করে রেল চালিয়ে ইতিহাসের পিন্ডি চটকানো হয়নি। এখনও ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মিনিটে মিনিটে বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে ভোঁ বাজাতে বাজাতে এগোয় টয়ট্রেন। টুকটুক করে ওপরে ওঠে বড়ো বড়ো পাহাড়ি লুপগুলোকে ঘিরে ঘিরে। হঠাৎ করে অনেকটা ওপরে উঠতে হলে ট্রেন মুখ না ঘুরিয়ে জেড-এর মতো একটা লাইন ধরে পিছিয়ে এসে ওপরের লাইনের সঙ্গে মুখকে সমান করে, তারপর হুস্ করে ওপরে উঠে যায়। দুটো লাইন মিশছে এমন জায়গার মুখে এসে প্রতিবার ট্রেন থেমে যায় আর কোনো রেলকর্মী হাত দিয়ে এই লাইনের নাটবল্টু খুলে পা দিয়ে লাথি মেরে মেরে এদিকের লাইন ওদিকে নিয়ে গিয়ে আবার ওদিকের নাটবল্টু লাগিয়ে দেন। কারসাজিটা ঠিক কি হয় কেন হয় বুঝিনি, তবে অত্যাধুনিক সিগন্যালিং-এর যুগে এইসব দৃশ্য বেশ মজার লাগে।

এইসব ম্যানুয়াল ব্যবস্থাপনায় অনেকটা সময় যায়। কাজেই সেকালের মতো একালেও টয়ট্রেন চলে সাত ঘন্টা ধরে। তবে পুরো পরিকাঠামোটা যত্ন করে ধরে রাখার দায় ও দায়িত্ব সেকালের মানুষের মধ্যে যতটা ছিল এখন ততটা আর নেই। উপরন্তু এর মধ্যে আমরা দায়িত্ব নিয়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়িয়েছি, গুচ্ছ গুচ্ছ গাছ কেটেছি। তাই আগের থেকে পাহাড়ে ধস নামে অনেক বেশি। সেই জন্যই নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং এই পুরো রাস্তাটা টয়ট্রেন চলছে এমন ঘটনা ভারি দুর্লভ। এই এতদিনে এই আধবুড়ো বয়সে অবশেষে সেই সুযোগ এল! যদিও কার্শিয়ং থেকে দার্জিলিং অংশে টয়ট্রেন চলে মোটামুটি নিয়মিত। আর দার্জিলিং থেকে ঘুম ঘুরে দার্জিলিং ফিরে আসার একটা ঘন্টা দুয়েকের ‘জয় রাইড’-এর ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এভাবে টয়ট্রেনের মাহাত্ম্য বোঝা সম্ভব নয়। টয়ট্রেনের আসল মজা শুরুর অংশেই। শিলিগুড়ির পরের স্টেশন শুকনা থেকে যখন ট্রেন সমতল ছাড়িয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ওপরে ওঠে, যখন মাঝে মাঝেই জানলা দিয়ে মাথা বের করে মনে হয় এই সামনের বাঁকটার পর গাড়ি আর এগোতেই পারবে না আর ঠিক তখনই গার্ডদাদা চোখ পাকিয়ে মাথা ঢুকিয়ে নিতে বলে, নাহলে পাশের পাথরে বা গাছে মাথা ঠুকে যাবে। আর মধ্যে মধ্যে ঝোপঝাড় ঘাসপাতা জানলা ভেদ করে ঢুকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়।

বনছোঁয়া পথ
  
জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে

DSC_8064

বনছোঁয়া পথ মনছোঁয়া হয় যখন দুধারে চ্যাপ্টা নাক ছোট্ট চোখের খুদেগুলো অনাবিল হাসিতে টা-টা করে। এখনও! ওদের কাঠের ঘরের গা ঘেঁষে, এর বাড়ির উঠোন ওর বাড়ির কলতলা দিয়ে কু-ঝিকঝিকিয়ে এগোয় খেলনাগাড়ি। রেলিং-এ কালো কালো প্লাস্টিকের মধ্যে রাখা ফুলগাছগুলোকে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। সত্যি বলতে কি এসব ছবি গাড়ির রাস্তাতেও দেখা যায়, কিন্তু পথের সঙ্গে এমন গা ঘেঁষাঘেঁষি আন্তরিকতা শুধু টয়ট্রেনেই সম্ভব। আর গাড়ির রাস্তা তো এই সেদিনের খোকা। তার বহু বহু বছর আগে যখন এই জঙ্গলে বাঘ-চিতাবাঘ-সাপ যথার্থই গিজগিজ করত, তখন কারা সব এই ভয়ংকর পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছিল, নিখুঁতভাবে হিসাব কষে বেছে নিয়েছিল সেইসব পাহাড়ি ঢাল, যেগুলি দিয়ে সবচেয়ে কম ঝুঁকি ও ঝামেলায় রেল চালানো যাবে।

6

Darjeeling Toytrain
রংটাং স্টেশন

টয়ট্রেন আসলে আমাদের কোত্থাও নিয়ে যায় না। শুকনা, তিনধারিয়া, কার্শিয়ং, সোনাডা, ঘুম, দার্জিলিং – কোত্থাও নয়। ওই যে বললাম টাইমমেশিন। টয়ট্রেন আমাদের নিয়ে যায় অন্য টাইমফ্রেমে। পুরো জার্নিটাই ভাবনার রাজ্যে। ভাবতে না পারলে সাত ঘন্টা ধরে ঢিকঢিকিয়ে যাওয়াটা ভারি বোরিং লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই দার্জিলিং-ঘুম-দার্জিলিং পথে দুঘন্টার ‘জয় রাইড’টাই ঠিক আছে। সেলফি-টেলফি তোলার জন্য ওই যথেষ্ট!