বিষ্ণুপুরের ঝাপান উৎসব (Jhapan Festival of Bishnupur)

[Excerpt: Jhapan Festival is held in few places of West Bengal, India on the last day of Bengali month of Sharavana (mid August). The celebration is devoted to the ill-tempered deity Manasa, the Goddess of Snakes. Bishnupur is the best place for experiencing Jhapan. A procession of snake-charmers in front of Royal Palace is the highlight of the festivals. Snake-charmers display different tricks with poisonous snakes in public]

আজ ১৭ অগাস্ট ২০১৯। বাংলা ক্যালেণ্ডার বলছে আজ শ্রাবণমাসের শেষ তারিখ। মনে পড়ল আজ থেকে ছ’বছর আগে আজকের দিনেই এমন এক ভিজে চুপচুপ রাত্তিরে বিষ্ণুপুরের হোটেলে বসে ঘ্যানঘ্যান করছিলাম। ঝেঁপে বৃষ্টি এসে ঝাপান উৎসবের ঝাঁপ ফেলে দিলে মনের অবস্থা যা হয় আর কি! তারপর তো গঙ্গা-সিন্ধু নীল-ইউফ্রেটিস দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল! এ ক’বছরে ভ্রামণিক হিসাবে অনেক বিবর্তন ঘটেছে নিজের মধ্যেই সেটা বেশ টের পাই। আজ সন্ধ্যেবেলা সেদিনের সেই ঘ্যানঘ্যানে সন্ধ্যেটার কথা ভেবে নিজের ছেলেমানুষির জন্য নিজেরই করুণা হচ্ছিল।

গ্রামবাংলায় শ্রাবণের শেষদিনে মনসাপুজো হয়। বিষ্ণুপুরে মনসাপুজোর বিশেষ আকর্ষণ ঝাপান উৎসব। ওই যেখানটায় একটা ফাঁকা মতো জায়গাকে ঘিরে জোড়বাংলা মন্দির, লালজি মন্দির, বিষ্ণুপুর রাজবাড়ি এসব আছে, ওইখানে মনসাপুজোর দিন সন্ধ্যে হওয়ার মুখে সাপুড়েরা সব শোভাযাত্রা করে আসতে থাকে। আগেকার দিনে লোকের ঘাড়ে মাচার মতো কোনো একটা জিনিসে চেপে আসত ওরা। এই জিনিসটাকেই নাকি ঝাপান বলা হত। এখন অবিশ্যি ভ্যানরিকশার জমানা। তবে সাপুড়েরা তার ওপরে বসে থাকে মাটির তৈরি বাঘের পিঠে। রাজবাড়ির সামনে এসে শোভাযাত্রা থামলে সাপুড়েরা সাপ খেলা দেখানো শুরু করে। বিন বাজিয়ে সাপ নাচানো নয়। সাপের ঘেঁটি ধরে নানান কায়দাকানুন।

এই লোকউৎসবে বরাবরই উৎসাহ যুগিয়ে এসেছেন বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা। মল্লরাজবংশের প্রবর্তক আদিমল্ল নাকি ছোটবেলায় এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে প্রতিপালিত হয়েছিলেন। একদিন মাঠে গরু চরাতে গিয়ে গাছতলায় ঘুমিয়ে পড়েন। পালক-বাবা খুঁজতে এসে দেখেন ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে আর পাশে এক বিষধর সাপ কিচ্ছুটি না করে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সেই থেকেই মল্লরাজারা সাপকে বেশ খাতির করেন। কাজে কাজেই সাপুড়েদেরও। অন্ত্যজ বলে তাদের ধুরছাই করেননি। বরং ঝাপানের দিনে সাপুড়েরা এসে প্রথম রানিমাকে খেলা দেখালে তবেই উৎসব শুরু হত।

এই যে এত ইতিহাস বললাম, ভুলেও ভাববেন না এসব ওখানে গিয়ে জেনেছি। সবজান্তা গুগলবাবাজির দ্বারস্থ হলে আপনারাও জানতে পারবেন এসব কথা। তাহলে ওখানে গিয়ে জানলামটা কী? কিস্যু না। জানতে পারিনি, কারণ জানতে চাইনি। সে আমলে এমনই অগামার্কা পাবলিক ছিলাম যে বেড়াতে গিয়ে খালি ছবির ফ্রেম খুঁজতাম। এই ছবি-ছুঁকছুঁক চিত্তে ঝাপান উৎসব বড় দাগা দিয়েছিল। উৎসব শুরু হল মহাসমারোহে। গড়দরজার মধ্যে দিয়ে শোভাযাত্রা করে সাপুড়েরা সব আসতে লাগল পরপর। কিন্তু যাত্রার শোভা উপভোগ করার উপায় নেই ভিড়ের ঠেলায়! সে কি চিঁড়ে-চ্যাপ্টা ভিড় রে বাবা! তার মধ্যে আমি নাটা মানুষ। ক্যামেরার ফ্রেমে রাশি রাশি মানুষের মাথা, মোবাইল-ক্যামেরা তোলা উদ্যত হাতের সারি। একটু এদিক ওদিক গিয়ে ভালো করে কম্পোজিশন করার উপায় নেই। ভিড়ের মধ্যে আটকে নড়নচড়নহীন একেবারে। একটাই সাপুড়ের ছবি তুলে গেলাম খালি। এরই মধ্যে নারীজন্মগ্রহণের খেসারত দিতে হল একাধিকবার। আমি এসব ক্ষেত্রে বাড়িতে মা-বোনের উপস্থিতির খোঁজ না করে সবসময়ই অবাঞ্ছিত স্পর্শের ঋণ চড়-থাপ্পড়-ঘুঁষি, চোখে আঙুল ঢোকানো দিয়ে শোধ করে থাকি। এক হাতে ক্যামেরা বাঁচিয়ে সে সব ‘শোধ’পর্বও চলতে লাগল সমান তালে। এদিকে মায়াবী নীল সন্ধ্যের আকাশে পোড়ামাটির মন্দিরকে ব্যাকড্রপে রেখে সাপখেলার ছবি তোলার আশায় জল ঢেলে দিতে আকাশ গুড়গুড়িয়ে উঠল। তারপর যেন গোটা আকাশটাই ভেঙে পড়ল ঝরঝরিয়ে। সাপ-সাপুড়ে, জনসমাগম মুহূর্তে ছারখার।

Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
ফোন ও ফণা
Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
ঝাপান উৎসবের সাপখেলা
Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
ঝাপান উৎসবের সাপখেলা

দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে গড়দরজার নিচে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ। সে রাতে আর বৃষ্টি থামল না। সাপখেলাও হল না। একরাশ বাজে-লাগা নিয়ে ভিজে ভিজে হোটেলের পথ ধরলাম। ওই গড়দরজার নিচে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই স্থানীয় একজন অজিত ধীবরের পাড়ার হদিশ দিয়েছিল। অজিতবাবু শোভাযাত্রায় আসা সাপুড়েদের মধ্যে সবচাইতে প্রবীণ। ওদের পাড়ায় মনসাপুজো হয়। আর আগামীকাল বিকেলে ওখানে মনসাপুজোর ফাংশনে সাপ খেলা দেখানো হবে।

ঐতিহ্যের ঝাপান উৎসবের বদলে ফাংশনের বাঁধামঞ্চে সাপখেলা দেখার প্রতি আমাদের যে বিশাল কিছু আগ্রহ ছিল তা না। তাছাড়া পরদিন বিকেলে আমাদের ফেরার ট্রেন ধরার আছে। তাও কি মনে হল, সকালের দিকে চলে গেলাম ওই পাড়ায়। খুঁজে খুঁজে অজিতবাবুর বাড়ি। বাড়ির কাকিমা-বৌদিরা যত্ন করে নিয়ে গিয়ে ঘরে বসালেন। মনসাপুজোর তালের বড়া খেতে দিলেন। শাঁখাপলা হাত, ভোঁতা নখের আঙুল দিয়ে ঘিরে ধরা কাঁসার গ্লাসে জল। প্রাণ ঠাণ্ডা করা এই গল্পেরা জীবনের ভাঁজে ভাঁজে জমা হয়ে একটু একটু করে শিখিয়েছে যে ভালো কম্পোজিশান নিয়ে হাপিত্যেশ করাটাকেই বেড়ানো বলে না। তাও একবারেই কি শিখেছি? অজিতবাবু বাড়ি আসার পরও তো জানতে চাইলাম না সাপেদের নিয়ে তার বেঁচে থাকার গল্প, কেমন করে তার সাপুড়ে হয়ে ওঠা, সাপের খেলা কত রকম ও কী কী তাদের বিশেষত্ব। ঝাপান উৎসবের ইতিহাস জানতে আজও যে নেট ঘাঁটতে হয় সে কেবল আমাদেরই বেড়ানোর ব্যর্থতা। বৃষ্টি নয়। আমাদের অসম্পূর্ণ ভ্রমণের দায় আমাদেরই কৌতুহলহীনতা। অজিতবাবু আর গ্রামের অন্য সাপুড়েরা মনসামূর্তির সামনে সাপ খেলা দেখালেন। সাপখেলা তো আগেও দেখেছি। নতুন কিছু না। তাও গুছিয়ে ছবি তুললাম৷ অপ্রয়োজনীয় কিছু ছবি। সেসব না তুললেও চলত। গত সন্ধ্যেয় ঝাপান উৎসবের ছবি ভালো করে হয়নি, তাই উশুল করছিলাম আর কি!

ছবি, ছবি, ছবি! তোমার ভ্র’মন’ নাই?

Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
অজিতবাবু
Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
সাপগ্রস্ত
Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
মনসামূর্তির সামনে সাপখেলা
Snake-charmers' display in Jhapan Festival, Bishnupur, India
অজিতবাবু ও উত্তরসূরী

আরও উৎসবের গল্প শুনতে পালাপাব্বন-এ টোকা মারুন।

Advertisements