মিজোরামের চাপচারকুট উৎসব (Chapchar Kut Festival of Mizoram)

[Excerpt: Chapcharkut is the spring festival of Mizoram, held on the month of February-March after the jungle-cleaning tusk of Jhum cultivation has done. Every year, in Aizwal, the capital city of Mizoram, Chapchar Kut is observed in Assam Rifle Ground on the first Friday of March. It is a daylong celebration with dance, music, dance-drama, sports, food and fun. But the highlight of the day is the Cheraw Dance or Bamboo Dance. Here almost thousand people dance together. Chapchar Kut of Aizawl holds Guinness Book of  World Record for the largest participation in Cheraw Dance.

For details, please feel free to write us in the comment section]

যখন দেখলাম ট্র্যাডিশনাল পোশাকে-মুকুটে-গয়নায় পুরোদস্তুর সাজুগুজু সত্ত্বেও মেয়েগুলো চড়া মেক-আপ করেনি আর ছবি তোলার সময় প্রাণখোলা মিষ্টি হাসিতে সোজাসুজি ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছে, ঘাড় বেঁকিয়ে মোহময়ী কটাক্ষ-ফটাক্ষ দিয়ে আবেদন-টাবেদন সৃষ্টি করার কোনো চেষ্টা নেই, আর এত্ত বড়ো একটা উৎসবের জমায়েত সত্ত্বেও শহরের এক কুচি আকাশও বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংএ মুখ ঢাকেনি, তখন মনে হল যাক বাবা ঠিক জায়গাতেই এসেছি। হুজুগে সামিল হইনি, সামিল হয়েছি উৎসবে। সত্যিকারের উৎসবে। কলকাতা থেকে আইজল উড়ে আসা সার্থক।

মিজোরামের বসন্তোৎসব চাপচারকুট। যদিও রঙ খেলার ব্যাপার নেই, বরং উপলক্ষটা অনেকটাই আমাদের নবান্নের মতো। ঝুমচাষের পর নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উদ্‌যাপন। বিভিন্ন মিজো গ্রামে আলাদা আলাদা দিনে চাপচারকুট পালিত হলেও রাজধানী আইজলের মাঠে যে চাপচারকুট হয় তা সবচেয়ে জমকালো, আর পালন করা হয় প্রতি বছর মার্চের প্রথম শুক্রবার। ঘটনাচক্রে এ বছর সেদিনটা হোলি ছিল। সারা দেশে যখন বেলুন-পিচকিরি-আবিরের ‘হোলি হ্যায়’ হুল্লোড়, তখন ভারতের এক্কেবারে পুবপ্রান্তের পাহাড়ি শহরটাতেও রঙের মেলা। লালে-সাদায়-কালোয় কি অসম্ভব উজ্জ্বল রঙিন পোশাক ওদের! চোখ ফেরানো যায় না। শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবে যেমন যারা নাচগান করে তারাই শুধু নয়, আমরা দর্শকরাও নিজেদের সাজিয়ে তুলি হলুদ শাড়িতে-পাঞ্জাবিতে, পলাশের মালায়, এখানেও ঠিক তেমনি ছেলেমেয়ে সকলেই সেজেছে ট্র্যাডিশনাল মিজো পোশাকে-গয়নায়। সমস্ত বড় অনুষ্ঠানের মতো চাপচারকুটও শুরু হল কেউকেটাদের ভ্যাজরং ভ্যাজরং দ্বারা পাবলিককে তুমুল বোর করার মধ্যে দিয়ে। আমার অগত্যা মাঠের গ্যালারিতে বসে বসে দেখতে লাগলাম সারা মাঠ জুড়ে বাঁশ পড়ছে। না না প্যান্ডেল হবে না। নাচ হবে – বাঁশের নাচ। ব্যাম্বু ড্যান্স বা ‘চেরাও’ উত্তর-পূর্ব ভারতসহ সারা দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেই বেশ জনপ্রিয়। এক-একটা দলে দশ-কুড়ি জন করে থাকে। ছেলেরা বাজনার তালে তালে বাঁশ এদিক ওদিক করে আর মেয়েরা বাঁশের এ পাশে ও পাশে পা দিয়ে দিয়ে নাচে। আইজলের চাপচারকুটে যেভাবে এই ‘চেরাও’ নাচ হয়, তেমনটা পৃথিবীর আর কোথাও হয় না। পুরো মাঠ জুড়ে প্রায় শ-খানেক দল একসঙ্গে নাচে। কিছু বছর আগে ‘চেরাও’ নাচের এই বৃহত্তম জমায়েত গিনেস বুকে নাম তুলেছে। ব্যাপারটা ঠিক কেমন তা নিয়ে কথা খরচ করে লাভ নেই। কিছু ছবি ও ভিডিও দিয়েছি লেখার সাথে তা থেকেই বোঝা যাবে। বা হয়ত পুরোটা যাবে না, যাওয়া সম্ভব নয়। বাজনার তালে তালে এতগুলো মানুষের যে আশ্চর্য নির্ভুল সিঙ্ক্রোনাইজেশন গ্যালারিতে বসে চাক্ষুষ করেছি, আর সেই হাজার জোড়া বাঁশের সম্মিলিত ঠকাস ঠকাস আর তার সঙ্গে একটা প্রবল উত্তেজনা যদি কেউ একটা স্টেপও ভুল করে সঙ্গে সঙ্গে বাঁশের মধ্যে পা আটকে পা ভেঙে পড়ে যাবে… এই সবটা কি আর ছবিতে বা লেখায় ধরা যায়!!!

মিজোরামে চাপচারকুট যত বড় উৎসবই হোক না কেন, ভারতবর্ষের কজন মানুষ তার খবর রাখে? কেই বা দেখতে আসে বাইরে থেকে! সেদিন হয়ত মাঠে হাতে গোণা জনা পনেরো মানুষ ছিলেন ভারতবর্ষের অন্য জায়গা থেকে আসা। তাই বাঁশের নাচ শেষ হতে আমরা যখন গ্যালারি থেকে নেমে মাঠে ঢুকে পড়লাম, তখন মাঠে যদিও দর্শকদের থাকতে দেওয়া হচ্ছিল না, কিন্তু দুজনেরই গলায় বড় ক্যামেরা দেখে পুলিশ হয় আমাদের প্রেস ফোটোগ্রাফার ভেবে ভুল করেছিল, নয়ত ইচ্ছা করেই বাইরের অতিথি বলে মাঠে থাকার প্রিভিলেজ দিয়েছিল। কারণ যাই হোক, এইভাবে মাঠে থাকতে পারায় আমরা পরবর্তী অনুষ্ঠান ‘কস্ট্যুম প্যারেড’ একদম সামনে থেকে দেখতে পেলাম। সেই গাছের ছাল-পাতা পরা যুগ থেকে শুরু করে এই স্মার্টফোনওয়ালা যুগ অবধি মিজোরামের ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ছোটো ছোটো পথনাটকের আকারে তুলে ধরা হল। একটি বাজনার দল স্টেজে উঠে নানারকম ট্র্যাডিশনাল মিজো বাজনা বাজিয়ে দেখাল। তারপর মিজোদের নানারকম খেলাধূলার প্রদর্শন হল। এর মধ্যে দুদল লোক মাঠের মধ্যে ঢুকে ঝগড়াঝাটি শুরু করল। মানে নকলি ঝগড়া আর কি! সম্ভবত মিজোদের গোষ্ঠিদ্বন্দ্ব গোছের কিছু একটা দেখানো হচ্ছিল, যার শেষে সবাই কুস্তি লড়তে লাগল। আমরা আর কি করব! কিছুই না বুঝে ছবি তুলতে লাগলাম, কারণ যাবতীয় ভাষ্যপাঠ মিজোভাষাতেই হচ্ছিল। এরই মধ্যে দেখি আমাদের চারদিক ঘিরে সাদা-কালো পোশাকে ছেলেরা আর লাল-কালো পোশাকে মেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো বৃত্ত রচনা করেছে সারা মাঠ জুড়ে। কিছু একটা নাচ হবে বুঝে গ্যালারির দিকে এগোব ভাবলাম, কিন্তু সেই নাচিয়েদের চক্রব্যূহ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়ার আগেই নাচ শুরু হয়ে গেল। আমরা গোলের মাঝে দাঁড়িয়েই নাচ দেখলাম আর ক্লিকক্লিকালাম। নাচটার নাম কুয়ালাম।

পাশের ফুডকোর্ট থেকে সওচিয়ার(মিজো খিচুড়ি) খেয়ে মাঠে ফিরে দেখি সমস্ত দর্শক মাঠে নেমে নাচানাচি শুরু করেছে ব্যাণ্ড মিউজিকের তালে তালে। উত্তর-পূর্ব ভারতে রক মিউজিকের জনপ্রিয়তার ব্যাপারটা জানতাম। কিন্তু সামনে থেকে অভিজ্ঞতা প্রথম। এমনিতে ঢিক্‌চ্যাক ঢিক্‌চ্যাক হার্ড রক শুনতে আমার বেজায় খারাপ লাগে। কিন্তু মিজোদের সফট রকে এমন মিঠে মেঠো সুর, ভারি একটা ভালো লাগার আবেশ তৈরি করছিল। আর দুচোখ ভরে দেখছিলাম মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, উদ্দাম নাচানাচি, চোখেমুখে উপচে পড়া আনন্দের আলো। একসময় দেখলাম সবাই সবাইকে কিছু না কিছু খাইয়ে দিচ্ছে। যেন বিজয়ার মিষ্টিমুখ। আসলে পুরো পরিবেশেই কেমন একটা দশমীর সুর ছিল যেন। উৎসব শেষ হয়ে যাবে একটু বাদেই। তাই ভাসানের নাচ নেচে নিতে হবে তুমুল, ফুরিয়ে আসা সময়কে নিংড়ে চেটেপুটে নিতে হবে আনন্দের শেষ বিন্দুটুকু।

তারপর সত্যিই নটেগাছটি মুড়োলো। এক বুক জঞ্জাল নিয়ে খাঁ খাঁ করতে লাগল উৎসবক্লান্ত মাঠ আর গ্যালারির সিটগুলো। আসছে বছর আবার হবে। তবে আমরা থাকব না। বা হয়ত থাকব। ‘হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনোখানে’… অন্য কোনো এমন সত্যিকারের উৎসবে!

চাপচারকুট উৎসবের কিছু টুকরো মুহূর্ত গাঁথা চলচ্ছবি

 

আরও উৎসবের গল্প শুনতে পালাপাব্বন-এ টোকা মারুন।

Advertisements