‘বন্ধুভরা বসুন্ধরা’

কফিতে কিছু মিশিয়ে দেয়নি তো? চিন্তাটা মাথা থেকে সরছিল না কিছুতেই। মাঝরাতে মধ্য তুরষ্কের গোরেমে গ্রামে যখন বাস থেকে নামলাম, শুনশান অন্ধকারে, হোটেল কিভাবে খুঁজে পাব ভাবছি, ঠিক এমনি সময়েই কোথা থেকে হাজির হয়েছিল সে। শীতের রাতে তার কাঠের ঘরে একটু উষ্ণতা, একটু আশ্রয় আর ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। আমরা চাইনি। সে দিয়েছিল। বিষিয়ে যাওয়া ‘সামাজিক’ মন আমাদের। বদ মতলবের গন্ধ খোঁজে কেবল। তাই বারবার এভাবেই কত উষ্ণতামাখা মুহূর্ত হাতের মুঠো গলে বেরিয়ে যায়, সন্দেহের কাঁটা গোপন করতে ওপর ওপর বন্ধুতার হাসি ‘দেখাই’ তাদের, যারা আদতে বন্ধুই ছিল।

এমনি ভাবেই দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকে বন্ধুরা। আমাদের বন্ধুরা। অনেক টাকায় কেনা ট্রাভেল কোম্পানির প্যাকেজ্‌ড ‘পরাধীনতা’কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শস্তায় স্বাধীন স্বনির্ভর দুনিয়াদারি করতে পারি; দেশ হোক, বা বিদেশ, অবলীলায় চলে যেতে পারি যে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সে শুধু এই বন্ধুদের ভরসাতেই। জানি তো ডুবব না কিছুতেই, বন্ধুরা আছে তো! এয়ারলাইন্সের বদান্যতায় হারিয়ে যাওয়া চেক ইন লাগেজ বোর্নিওর এক সদ্য আলাপ হওয়া ট্যাক্সি ড্রাইভারের উদ্যোগে চব্বিশ ঘন্টা পর ঠিক পৌঁছে যাবে তিনশো কিলোমিটার দূরে, প্রশান্ত মহাসাগরের বুকের এক একরত্তি দ্বীপে আমাদের ডেরায়। সন্ধ্যার নিভু নিভু অন্ধকারে যখন কিছুতেই ঠাহর করতে পারব না জোয়ারের জলে ডুবে যাওয়া বেজায় শ্যাওলা-পিছল পাথরগুলোকে, তখন পাপুয়ার সেই অচেনা আদিবাসী মেয়েটার মুঠোয় ধরা থাকবে ভয়ে ঘেমে যাওয়া আমার হাতের তালু আর সে দাঁড়িয়ে থাকবে, দাঁড়িয়েই থাকবে যতক্ষণ না ওই বিপজ্জনক অংশটুকু পুরোটা নিরাপদে পার হয়ে যাই। যে বছর হাল্লায়-শুন্ডিতে যুদ্ধু বাঁধবে, সেই বছর আমরা ঘুরে বেড়াব উত্তর-পশ্চিম চিনের কাজাখাস্তান ঘেঁষা এলাকায়, আর পদে পদে সিকিউরিটি চেকিং – ভারতীয় হওয়ার খেসারত! সেই সময় আদিল, আমাদের চিনা ড্রাইভার আদিল কখনো মজার কথায় পুলিশকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, কখনো আমাদের হয়ে অনুরোধ করে, কখনো বা তর্ক করে আমাদের হাতে ধরে পার করে দেবে একটার পর একটা সিকিউরিটির হার্ডল। ভোটের পরের দিন যখন ইম্ফলের শুনশান রাস্তায় বন্দুকধারী সেনাবাহিনীর রাতপাহারা, তার মধ্যেও রাত দুটো অবধি মন্দিরে রাসপূর্ণিমার অনুষ্ঠান দেখব নিশ্চিন্তে, কারণ সেই মাঝরাতেও হোটেলে ফেরার একটা গাড়ি ঠিক জুটে যাবে পুরোহিত কিরণকুমারের উদ্যোগে আর হোটেলে ঢোকার মুখে ড্রাইভারের মোবাইলে ফোন আসতে থাকবে, যতক্ষণ না আমরা নিরাপদে ঘরে পৌঁছাতে পারছি। কেউ একবর্ণ ইংরেজি জানে না, পাপুয়ায় এমন মানুষদের গ্রামে, এমন মানুষদের নির্ভাষ স্নেহ-ঝরা হাসির ভরসাতেই আড়াই দিন কাটিয়ে দেওয়া যাবে অনায়াসে, কারণ যে হাসি ভেতর থেকে আসে তার ভাষা পড়া যায়। চীনের শেয়ার কারের ইংরেজি-না-জানা সহযাত্রী মোবাইল খুলে চালিয়ে দেবে বলিউডি গান। আমরা তাকাব, হাসব। কোনো কথা হবে না আমাদের। শুধু হাসিটুকুই, এই নিঃশব্দ হাসিটুকুই চীন সরকারের কাঠ-কাঠ চোখ পাকানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সীমারেখা পেরিয়ে যাবে। থাইল্যান্ডের কোতাও দ্বীপে রাস্তায় ছোট গাড়িতে প্যানকেক বিক্রি করা ছেলেটা হঠাৎ করে হিন্দি বলে উঠলে চমকে যাব। কোথা থেকে এসেছো? কোথায় তোমার দেশ? এড়িয়ে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খোঁচাব না আর। কিছু গল্প থাক না পৃথিবীতে বেঁচে সীমারেখার আগলছাড়া হয়ে।

রাত-বিরেতে কম্বোডিয়া পৌঁছে যখন আমাদের ‘দেশ’-দেখা শুরু হবে হোমস্টের উল্টোদিকের গ্যারেজঘরে পাড়া-পড়শিদের আড্ডায়, তখন কখনও গাছ থেকে আম, কখনও বা জুঁইফুল পেড়ে এনে আমাদের খুশি করতে মহাব্যস্ত হয়ে পড়বে ওরা। বিয়ে হোক, বা নববর্ষ, কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, নদীর ধারের পিকনিকে বা উৎসবের ভোজে সামিল হওয়ার নেমন্তন্ন পাব বারবার, কিন্নরে-বোর্নিওয়-বিষ্ণুপুরে-সিয়েম রিপে – দেশেবিদেশে সর্বত্র। লাদাখের আর্যগ্রামে, মিজোরামের কুঁড়েঘরে, কি নীলনদের দ্বীপগ্রামে কত নিরালা দুপুরে হুটহাট ঢুকে পড়ব অচেনা বন্ধুর অন্দরমহলে; চায়ের সঙ্গে টা, আর বেঁচে থাকার হাসিকান্না চুনীপান্নারা ভাগাভাগি হবে এ তরফে ও তরফে। তুরষ্কের বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া গবেষক-ছাত্রটি এয়ারপোর্টের অল্প সময়ের আলাপেই তার শহরে গিয়ে থাকার নেমন্তন্ন করবে বারবার, তা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে আমাদের যেতে না পারার আক্ষেপটা থেকেই যাবে। আবার সাহারার মরুদ্যান-গ্রামে ঘর বেঁধেছে যে পাগলা বেদুইন, তার বাড়ি গিয়ে বায়না ধরব যে হোটেল নয়, এখানেই থাকব আর সে তৎক্ষনাৎ বাগানে একটা তাঁবু খাটিয়ে আমাদের রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত করে দেবে। পাম ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে সুলাবেসির নৌকাবাড়ির কর্তা ওসমান ভারতবর্ষ থেকে আসা অতিথিদের শেখাবে ‘ওম্‌’ শব্দের সঙ্গে আই অ্যাম-এর ভাষাতাত্ত্বিক মিল আর ‘ওম্‌’ উচ্চারণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আত্মোপলব্ধির বোধ। তার খ্রিষ্টান গিন্নি মেরি নিজেদের রান্না করা ব্যাম্বু চিকেনের পাত্রটা আর একটু এগিয়ে দেবে যাতে আমাদের ভুরিভোজে একটুও খামতি না থাকে। পন্ডিচেরীর স্কুবা ডাইভিং স্কুলে মাস্টারমশাই থেকে বন্ধু হয়ে ওঠা টিম, আমাদের চাইতে আট বছরের ছোট টিম কোন এক দিন মোজাম্বিকে নিজস্ব একটা ডাইভিং স্কুল খোলার স্বপ্নের কথা বলবে আমাদের। প্রশান্ত মহাসাগরের দূরদ্বীপবাসী যে কিশোর পয়সার অভাবে কলেজে না পড়ে মাঝিমাল্লার কাজ করছে, নির্জন সমুদ্রতীরে তারায়-ভরা আকাশের নিচে বসে সে জানাবে একদিন নিশ্চয়ই পয়সা জমিয়ে কলেজে পড়বে সে। বলিউডের সিনেমায় দেখেছে চুল এলানো, আঁচল ওড়ানো, বিন্দি পরা সুন্দরীদের। আচ্ছা, ভারতীয় মেয়েদের প্রোপোজ করার সময় কী বলতে হয়? আমরাও সুযোগ পেয়ে গুছিয়ে টিপ্‌স দেব। উইঘুর ট্যাক্সিচালক ভাড়া নিতে চাইবে না, কারণ সওয়ারিরা ওর প্রিয় গায়ক অরিজিত সিং-এর দেশের শুধু না, একেবারে রাজ্যের লোক। ইস্কুলে পড়াকালীন রবীন্দ্রনাথের ‘কৃপণ’ কবিতা ইংরেজি অনুবাদে পড়েছিল মেঘালয়ের যে পাড়াগেঁয়ে গরীবঘরের ছেলেটা, পড়াশোনা বেশিদূর হয়নি তার আর, কিন্তু সে যখন তার স্বচ্ছ সরল বোধের আলোয় ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ‘কৃপণ’-এর ব্যাখ্যা করবে, শুনতে শুনতে মনে হবে আমাদের খালি পন্ডিতিই আছে – আহা এমন সহজ ভাবনা যদি থাকত গো! নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফুটবল বা হিটলারের কারণে যে জার্মানরা ছিল দুচক্ষের বিষ, তাদেরই একজন লখনৌয়ের হোমস্টেতে দাঁড়িয়ে আগের রাতে যখন বলবে কাল সকালের কাবাবহপিং-এ আমায় সঙ্গে নিও, তখন মনে পড়বে যোগজাকার্তার ফুটপাতে মাদুর পেতে বসে মাগুর মাছ খাওয়ার মজা চিনিয়েছিল যে স্থানীয় মেয়েটি, তার কথা। তার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্পরা ফুরায়নি আজও। ফুরাবে না কোনোদিন, বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে মেসেঞ্জারের আড্ডায়। এমন তো কতজনকেই ধরে রাখতে চাইব, কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়ার ভিড়ভাট্টায় আর খুঁজে পাব না তাদের। ত্রিপুরার পাহাড়ি পথে যে মেয়েটিকে লিফট দিয়ে ভাবব ভারি উদ্ধার করলাম তাকে, জঙ্গলে রাস্তা হারানোর পর সেই হবে আমাদের অন্ধের যষ্টি। সেই বন্ধুত্বকে ফেসবুকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েও হদিশ পাব না আর, যেমন পাব না সেই ছেলেটা আর তার বান্ধবীকে যাদের সঙ্গে একটা ছোট্ট ডিঙিতে চেপে দিনভর ভাসব সমুদ্রে আর সুন্দর প্রবালরাজ্য পেলেই সাঁতরাব প্রাণভরে। প্রাণ ভরে, প্রাণ জুড়ে থাকবে এভাবেই ওরা। পথের বন্ধুরা। ক্ষণিকের বন্ধুরা। স্টেশন এসে গেলে নেমে তো যেতেই হবে। রাজস্থানের বিশনই উপজাতির মেয়ে-বউরা অর্ধস্বচ্ছ ঘোমটার তলা থেকে মিনতিভরা চোখ মেলে বলবে – এখানেই নামছ কেন? চল না আমাদের সঙ্গে। আমরা যেখানে তীর্থ করতে যাচ্ছি, যাবে সেখানে? কি করে যাব বল? আমাকে তো নামতেই হবে সামনের স্টেশনে। আরও অনেক অনেক স্টেশনে। সব জায়গায় কত কত অজানা বন্ধু অপেক্ষা করে আছে না?

human collagefriends1friends