Bishnoi People – Protectors of Biodiversity

Bishnoi (Vishnoi) is a Hindu religious sect, residing in Rajasthan, India. They follow 29 principles given by their Guru Jambeshwar. They are directed not to cut trees or kill animals, birds, even insects. In this era of Global Warming these protectors of bio-diversity are truly commendable.

DSC_9485
Memorial for martyrs

 

DSC_9488
Khejrali Today
_DSC0399
Black Buck Deer
DSC_9524
Bishnoi lady, not interested in informal conversation

 

A train-journey with Bishnoi People

বিশনইদের সঙ্গে 

শুরুটা হয়েছিল বেশ একচোট কথা কাটাকাটি দিয়ে। আমরা যোধপুর থেকে সবে ট্রেনে উঠেছি ঘন্টা তিনেক দূরে নাগ্গরে যাব বলে। কি একটা দূর পাল্লার ট্রেনের জেনারেল কম্পার্টমেন্ট ছিল সেটা। কামরায় এমন কিছু ভিড় ছিল না। কিন্তু ওদের বিশাল দলটা উঠে ঠিক আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানেই গিজিগিজি করে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই এভাবে এক জায়গায় না থেকে সারা কামরা জুড়ে ছড়িয়ে যেতেই পারে তো! আমরা সে কথা বলতে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে কি যে সব বলল কিছুই বুঝলাম না। আমরা পালটা বোঝাতে গেলাম। এই নিয়ে তর্কাতর্কি করতে করতে ট্রেনের ভোঁ বেজে গেল। আর যেই না ট্রেন ছাড়ল অমনি ওরা সব্বাই বেশ কামরা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। মানে আর কি যতক্ষণ না ট্রেন ছাড়ে, ওরা ট্রেনে উঠে এক জায়গায় এককাট্টা হয়ে থাকে – এমনটাই ওদের রীতি। যাব্বাবা! বেকার ঝগড়া করলাম!

মনে মনে আফশোস করছি। কেন যে ঝগড়া করলাম! ওরা যে বিশনই! যোধপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ওই মাথায় টিকলি আর আধখানা মেরি বিস্কিটের মতো নথ পরা মহিলাদের দেখেই তো বুঝে গেছি ওরা বিশনই। কাল তো ঘটা করে এক বিশনই গ্রামেই ঘুরতে গেছিলাম। আর এখানে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন বিশনইয়ের দল আমাদের সহযাত্রী!

বিশনইদের সম্পর্কে অনেকেই জানেন। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বলি। মূলত যোধপুরের আশেপাশে এবং রাজস্থানের আরো কিছু এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশনই উপজাতির গ্রাম। বিশ অর্থাৎ কুড়ি আর নই মানে নয়। বিশনই হল ঊনত্রিশ। ওদের গুরু জাম্বোজির ঊনত্রিশটা নির্দেশ ওরা ওদের জীবনে মেনে চলে, সেই থেকেই এমন নাম। সেই নির্দেশগুলোর মধ্যে একটা নির্দেশ হল জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা। পশুপাখি, গাছপালা কাউকে নষ্ট করা যাবে না। বরং সকলের যত্ন নিতে হবে। বিশনইরা তাই গাছ কাটে না, প্রাণিহত্যা করে না।

আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে যোধপুরের মহারাজা প্রাসাদ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠের যোগান পেতে খেজরালি গ্রামের গাছ কাটার নির্দেশ দেন। খেজরালি বিশনইদের গ্রাম। ওরা দৌড়ে এসে এক একজন এক একটা গাছ আঁকড়ে ধরল সারা শরীর দিয়ে। রাজার নির্দেশে সেপাইরা মানুষসমেত গাছের গায়ে কুঠারের কোপ বসাল। ৩৬৩ জন মানুষ প্রাণ হারালেন এভাবে। নাহ প্রাণ হারালেন নয়। শহীদ হলেন। আমাদের ইস্কুল-আমলে ইতিহাসের সিলেবাস যাঁরা বানাতেন, তাঁরা এই সংগ্রামের গল্পকে বড়োই অকিঞ্চিতকর মনে করতেন হয়ত! তাই এসব আমরা ছোট থেকে জানতে পারিনি। সত্যিই তো! গাছ বাঁচানো আর কি এমন বড় ব্যাপার?

বিশনইরা এমনিভাবেই সকলের চোখের আড়ালে থেকে শতকের পর শতক জীববৈচিত্র্যের পাহারাদার হয়ে থেকেছে। হঠাৎ করে তারা প্রচারের আলোয় চলে এল সলমন খানের কারণে। বিশনই গ্রামগুলোর আশেপাশে প্রচুর কৃষ্ণসার হরিণের বাস। বিশনইরা কৃষ্ণসার হরিণদের ভারি যত্ন করে, খেতে দেয়। বন্য হরিণেরা পোষা প্রাণির মতো আদর পায় বিশনইদের ঘরে। তা এমন এক বিশনই গ্রামে গিয়ে আমাদের মহা-মাচো সলমন খান বাইসেপস ফুলিয়ে হুপহাপ করতে করতে কৃষ্ণসার হরিণ মেরে ফেললেন। দেশের কাগজে কাগজে বেরোল সেই কেচ্ছা। রিপোর্টাররা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিশনইদের দেখে এক্কেবারে তাজ্জব হয়ে গেলেন। বন আর বন্যপ্রাণ নিয়ে কিরকম আশ্চর্য ঘর-সংসার তাদের! এমনিতেই বিশনই মেয়েরা বড় বড় গয়নাগাটি পরার কারণে যথেষ্টই ফটোজেনিক। বিশনই মায়ের এক স্তন থেকে তার নিজের শিশু দুধ খাচ্ছে, আরেক স্তন থেকে দুধ খাচ্ছে কৃষ্ণসার হরিণের বাচ্চা। এমন ছবি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ বিশনইদের পর্যটনের আওতায় আনার কথা ভাবতে থাকলেন।

যোধপুরের অদূরে গুডা বলে একটা বিশনই গ্রামকে কেন্দ্র করে শুরু হল বিশনই ভিলেজ সাফারি। পর্যটকদের জিপে করে ওই এলাকার বন-জঙ্গলে ঘুরিয়ে শেষে গুডা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরাও এমন একটা টিপিকাল টুরিস্টি সাফারিতে গেছিলাম। গুডাগ্রামের এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে বাড়ির কর্তা গড়গড় করে বিশনইদের ইতিহাস মুখস্থ বলে গেল। তার গিন্নি হেঁশেল থেকে বেরিয়ে এসে একটা ভীষণ মেকি পোজ দিয়ে বলল – ‘ফটাফট ফটো লে লো।’ এত বিশ্রী লাগল। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম। আমরা তো দেখতে চেয়েছিলাম ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। চেয়েছিলাম ইনফর্মাল গল্পগুজব।

যা চেয়েছিলাম তার সুযোগ এখন আমাদের নাগালের মধ্যেই। বিশনইদের ত্রিশ-চল্লিশ জনের গ্রুপ তাদের টিকলি-নথ-ওড়না, ধুতি-ফতুয়া-পাগড়ি সমেত আমাদেরই সহযাত্রী। এদিকে ঝগড়া করে ফেলেছি যে! কি মুশকিল! ট্রেন ছুটছে রাজস্থানের আধা-শুকনো আধা-জঙ্গুলে এলাকা দিয়ে। দূরে একপাল কৃষ্ণসার হরিণ। আমি আর সৈকত হরিণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কি একটা বলছিলাম। আমাদের কথা কানে যেতেই পাশে দাঁড়ানো বিশনই বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন ওদের গ্রামে অনেক দেখা যায় কৃষ্ণসার হরিণ। ওরা পালতু জানোয়ারের মতোই যত্ন করে। ব্যাস বরফ গলে গেল মুহূর্তে। আমরাও হৈ হৈ করে গল্প করা শুরু করে দিলাম। বৃদ্ধ বলতে লাগলেন গুরু জাম্বোজির কথা। তাঁর নির্দেশের কথা। নাগ্গরের পরের স্টেশনে নামবেন ওঁরা। সেখানে মেলা বসেছে জাম্বোজির জন্মদিন উপলক্ষে। দুদিনের মেলা। ওরা সব এক গ্রাম থেকে দল বেঁধে যাচ্ছে। এমন আরও অন্য অন্য গ্রাম থেকেও বিশনইরা আসবে। শুনেই কি লোভ হল! মনে হল নাগ্গরে না নেমে ওদের মেলাতেই চলে যাই। কিন্তু সেদিন আমাদের নাগ্গর ফোর্ট দেখে রাতের ট্রেনে দিল্লি ফেরার কথা। কাল সকালে দিল্লি থেকে কোলকাতার ফ্লাইট। যদি আজই বেড়ানোর শেষ দিন না হত, তবে নির্ঘাত চলে যেতাম। কিচ্ছু করার নেই এখন। এদিকে ওরা লোভ দেখাচ্ছে – চলো আমাদের ওখানে। আমাদের সঙ্গে তাঁবুতে থেকে যাবে। আমরা ওখানে রান্না করব। আমাদের ওখানেই খাবে। আফশোস আফশোস! অবাক হয়ে ভাবি এই একটু আগেই ঝগড়া করছিলাম এদের সাথে। কেমন অনায়াসে ভুলে গিয়ে আপন করে নিল। যারা গাছ-মাটি-ফুল-পাখি আঁকড়ে বাঁচে, তারা বোধ হয় এমনই ইগো-হীন হয়।

খুব ছবি তুলতে ইচ্ছে করল। জানি এমন ক্ষেত্রে ধুমসো কালো এসএলআর বের করলে ওরা আড়ষ্ট হয়ে পড়বে। তাই মোবাইলই ভালো। অনুমতি চাইলাম।
– কেয়া করোগে ফটো লেকে? আপলোগ রিপোর্টার হো?
– নেহি নেহি। অ্যায়সেহি। আপলোগোঁকো ইয়াদ রাখেঙ্গে।
– নেটমে ডালোগে?
– আগর আপ নেহি চাহো, তো নেহি ডালেঙ্গে।
– ঠিক হ্যায়। ফটো লে লো। লেকিন নেটমে মত ডালনা।
শুরু হল ফটোসেশান। সৈকত ছেলেদের আর আমি মেয়েদের ছবি তুলতে লাগলাম। ছেলেরা বেশ স্বচ্ছন্দ ছিল। মেয়েরা ভারি লজ্জা পেতে লাগল। এরা কিন্তু গুডা গ্রামের বিশনই নয়। কোনো বাইরের লোক হয়ত আজ অবধি এদের ছবি তোলেনি। নারী-স্বাধীনতার দৌড়ে আমার থেকে এক শতাব্দী পিছিয়ে থাকা প্রত্যন্ত রাজস্থানি গ্রামের মেয়েরা! যারা লজ্জা কাটিয়ে ক্যামেরার সামনে এগিয়ে এল, এই এগিয়ে আসাটা তাদের জন্য বিশাল উত্তরণ। লজ্জা, লজ্জা ভাঙার আনন্দ, একটুখানি মুক্তির স্বাদ, একই সাথে বুক দুরদুর ভয় – কত্তরকম ভাবের খেলা ওদের চোখের ভাষায়, মুখের হাসিতে। শুধু আমাদেরই কেন ছবি তোলা হবে? আমাদের দলের বাকি মেয়েদের নয় কেন? এই যে বেড়া ডিঙানোর আনন্দ, এ তো সব্বার পাওয়া চাই। অতএব ওরা আমার হাত ধরে টানাটানি শুরু করল। কামরার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ওদের গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের কাছে নিয়ে গিয়ে শুরু হল ‘ইসকি ফটো লে লো, উসকি ফটো লে লো।’ কিংবা এমনও হতে পারে যে ওদের মনে ভয় ছিল। এসব ছবি তোলার কথা পরে গ্রামে জানাজানি হয়ে গেলে কী হবে? তাই সব্বাইকেই পাপের ভাগীদার করে রাখি! যাইহোক, এরকম জবরদস্তি ছবি তোলায় আমার আপত্তি ছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মুখ দেখে বুঝলাম সব্বারই ষোলো আনা ইচ্ছে তাদের ছবি তোলা হোক। তবু সংকোচ একরাশ! লজ্জায় রাঙা হয়ে কেউ মুখের ওপর ওড়না টেনে নিচ্ছে। অর্ধস্বচ্ছ ওড়নার আড়াল থেকে ওদের লজ্জা পাওয়া মুখগুলো আরও মিষ্টি দেখাচ্ছে। কেউ জিভ কেটে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে অন্যদিকে। আর অমনি নাছোড়বান্দা উৎসাহীর দল তার থোতনা ধরে ঘুরিয়ে দিচ্ছে আমার দিকে।

এইসব হৈ হৈ একটু থিতিয়ে এলে মহিলাকুলের মনে প্রশ্ন জাগল আমি আর সৈকত একে অপরের কে হই? উত্তর পাওয়ার পর ওরা আমার মাথার কাকের বাসায় আঙুল চালিয়ে কপাল থেকে ব্রহ্মতালু অবধি সরেজমিনে তদন্ত করে বলল – কই সিঁদুর পরোনি তো? সৈকত মজা করে বলল – ‘পতি কি শুনতি হি নেহি’। সেই শুনে হা হা হি হি হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল। ওদের মধ্যে একটি মেয়ের হাতে স্মার্টফোন ছিল। ফোনের মতো মেয়েটিও বেশ স্মার্ট। বাকিদের তুলনায় অনেক বেশি কইয়ে-বইয়ে। সে তার বিয়ের ছবি দেখাল মোবাইল খুলে। আমিও আমার বিয়ের ছবি দেখালাম। সেই দেখতে সমবেত মহিলাবাহিনী হুমড়ি খেয়ে পড়ল। স্মার্টফোনধারিণীর বর সেই কামরাতেই ছিল। আলাপ হতে জানাল যে সে গ্রামে থাকে না। শহরের কোনো মাড়োয়ারি কাপড়-ব্যবসায়ীর দোকানে কাজ করে। মাঝে মাঝেই তাকে কোলকাতা যেতে হয় মাল ডেলিভারি দিতে। আমি স্মার্টফোনধারিণীকে বললাম এর পরের বার কর্তার সাথে তুমিও চলে এসো কোলকাতায়। আমাদের বাড়িতে তোমাদের নেমন্তন্ন রইল।
– আগর ম্যায় আকেলে যাউঁ তো?
– কোই বাত নেহি। চলে আও।
– তুমহারে পতি ক্যেয়া কহেঙ্গে?
পতি? পতি আবার কী বলবে? অ্যাই পতি, কি বলছে শোন।
– আইয়ে আইয়ে জরুর আইয়ে।
সেই শুনে সব্বার কি হাসি কি হাসি! অনাত্মীয় পুরুষ পরস্ত্রীকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করছে, এরকম ব্যাপার ওদের সমাজে মোটেই ঘটে না। ওরা ভাবল সৈকত দারুণ একটা রসিকতা করল বুঝি!

এইসব হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই নাগ্গর চলে এল। ওরা ট্রেনের প্যাসেজ আটকে বলল – নামতে দেব না তোমাদের। চলো আমাদের সঙ্গে মেলায়। আসব গো। পরে আসব কোনোদিন। এই তো মনে রেখেছি ফাল্গুনি অমাবস্যায় গুরু জাম্বোজির জন্মদিন। নাগ্গরের পরের স্টেশনে নামতে হবে মেলার জন্য। ঠিক যাব কোনো বছর। মুখে বললাম বটে, কিন্তু জানি জীবন বড়োই ছোট। দেশে-দেশান্তরে এমন কত কি সম্ভার ছড়িয়ে আছে। যে সুযোগ একবার যায়, তা আর ফিরে আসে না।

আমরা কথা রেখেছি। ওদের যে ছবি তুলেছিলাম তা নেটে দিইনি। ছবি দেখে দেখে ছবি আঁকলাম। ইচ্ছে করে দুজন মহিলার মুখ মিলিয়ে এঁকেছি। তাতে চোখ-নাক-হাঁমুখের প্রোপরশনটা ঠিক হয়নি, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সফল। আঁকা ছবির মহিলাটিকে ওদের কারোর মতোই দেখতে হয়নি।

77011485_10207177600115250_5962174373677760512_o